Work out your own salvation. Do not depend on others.

— Buddha

হিন্দু ধর্মের উপাসনা পদ্ধতি

কর্ম

যা কিছু করা হয় তাকেই বলে কর্ম। ঈশ্বরকে আরাধনা করা সেটিও একটি কর্ম। তবে যে কর্মের
সঙ্গে ঈশ্বর চিন্তা যুক্ত থাকে সেটিই সংক্ষেপে কর্মযোগ বলা হয়। সাধক যখন তার সমস্ত কর্মফলকে
ঈশ্বরে সমর্পণ করেন এবং নিজে ঈশ্বরের পতিনিধি স্বরূপ হয়ে কর্ম করে থাকেন তখন তার কর্মকে
বলা হয় কর্মযোগ। কর্মযোগের ফল- ফলাকাঙ্খা বর্জন, কর্তৃত্ব- অভিমান ত্যাগ এবং কর্মফল ঈশ্বরে
সমর্পণ- এভাবে কর্মকরে একজন সাধক ঈশ্বর অনুগ্রহ লাভ করতে সমর্থ হয়। সংক্ষেপে এই হল
কর্মের মাধ্যমে ঈশ্বর উপাসনা পদ্ধতি।

জ্ঞান

কর্মের ন্যায় জ্ঞান অনুশীলনের মাধ্যমেও ঈশ্বর অনুগ্রহ পাওয়া সম্ভব। কর্ম করতে গিয়ে সাধক
উপলব্ধি করবেন তার নিজের মধ্যে যেমন তেমনি বিশ্বের সকল প্রাণীর মধ্যে একই আত্মা বিরাজ
করছেন। জগতের সব কিছু পরম আত্মার সত্ত¡ায় সত্ত¡াবান। জীব- দেহের আত্মাকে বলে জীবাত্মা।
জীবাত্মা ও পরমাত্মা মূলত একই; তবে খন্ডিত অবস্থায় জীবদেহে জীবাত্মা নামে পরিচিত। আর
সামগ্রিক দৃষ্টিতে সেটি পরমাত্মা। এই তত্ত¡ উপলব্ধি করে সাধক হন জ্ঞানী। তখন তিনি নিজেকে
ঈশ্বরের অংশ বলে উপলব্ধি করেন। তিনি বুঝতে পারেন দেহটা তিনি নন, তাঁর ভিতর যে আত্মা
রয়েছে সেটিই তার সত্ত¡া । দেহ মাঝে এই আত্মা আবদ্ধ হয়ে আছে। এই জীবাত্মাকে ঈশ্বর বা
পরমাত্মার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াসই হচ্ছে জ্ঞানের পথে ঈশ্বর উপাসনা।

যোগ

ঈশ্বর উপাসনার আর একটি পদ্ধতি হচ্ছে যোগ-সাধনা। সকল সাধনার প্রধান অবলম্বন হচ্ছে সুস্থ
কর্মক্ষম দেহ এবং মন। দেহকে আশ্রয় করে পরমাত্মার সাধন চলতে থাকে। তাই শাস্ত্রে বলা
হয়েছে- শরীরং খল্বাদ্যধর্মসাধনম্। অর্থাৎ শরীরই হচ্ছে ধর্ম-সাধনার প্রথম ও প্রধান উপকরণ।
তাই পদ্মাসন, সহজাসন, গোমুখাসন ইত্যাদি বিভিন্ন রকম যোগাসন অনুশীলনের মাধ্যমে দেহ ও
মনকে ঈশ্বর উপলব্ধির উপযোগী করে তোলা হয়। যোগাবলম্বন করে যিনি ঈশ্বর আরাধনা করেন
তিনি হলেন যোগী সাধক। সুনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয় এবং শান্তচিত্তে নিজ আত্মায় পরমাত্মার উপস্থিতি
লাভে যত্মবান হন যোগী। গীতায় বলা হয়েছে যে যোগী-সাধক যোগের মাধ্যমে তার মনকে ঈশ্বরে সংযুক্ত করেছেন তিনিই শ্রেষ্ঠ যোগী। পরমাত্মার সঙ্গে আপন জীবাত্মার সংযোগ সাধনই যোগ
সাধনার মুখ্য উদ্দেশ্য।

ভক্তি

ভক্তির পথে যে ঈশ্বর আরাধনা তাকে বলা হয় ভক্তিযোগ। ভক্তিযোগের সাধনায় সাধকের সগুণ
ঈশ্বরের কল্পনা থাকে। ঈশ্বরের অশেষ ক্ষমতা অনন্ত গুণাবলী স্মরণ করে সাধক ভগবানের
শ্রীপাদপদ্মে নিজেকে সমর্পণ করেন। ভক্তিযোগে জীব ও ঈশ্বরের সর্ম্পকটা সেব্য ও সেবকের।
যাকে সেবা করা যায় তিনিই সেব্য; আর যিনি সেবা করেন তিনি হলেন সেবক। ভক্তিযোগে সেব্য
হলেন ঈশ্বর আর সেবক হলেন ভক্ত নিজেই। ভক্তির অশেষ কৃপা। ভক্তি একদিকে ঈশ্বরকে ভক্তের
নিকটে নিয়ে আসে। অপর দিকে ভক্তকে করে ঈশ্বরমুখী। ভক্ত নিজে কিছু প্রার্থনা করেন না। ঈশ্বর
প্রীতি সাধনই তার উপাসনার মুখ্য উদ্দেশ্য। যেমন- শ্রীকৃষ্ণের প্রীতির উদ্দেশ্যে গোপীরা ছিলেন
সদা যতœশীল।
তোমার কুশলে কুশল মানি- এই অনুভূতি নিয়ে গোপীগণ পরমতত্ত¡ শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেছেন। কলি
যুগে ঈশ্বর আরাধনার জন্য ভক্তিযোগেরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শাস্ত্রে। ভক্তি ভক্তের হৃদয়কে
ঈশ্বর-উন্মুখী করে। অপর দিকে ভক্তিতে প্রীত হয়ে ভগবান ভক্তের কল্যাণে বিগলিত হন। তাই
বিভিন্ন উপাসনা পদ্ধতির মধ্যে ভক্তিযোগের সাধনাকে ঈশ্বর অনুগ্রহ লাভের সহজ উপায় বলে মনে
করা হয়।

আচার-অনুষ্ঠান

ধর্মের নিজস্ব কোন রূপ নেই। ধার্মিকব্যক্তির আচার-আচরণের মাধ্যমে ধর্মকে প্রত্যক্ষ করা যায়।
গৈরিক বসনধারী কোন ব্যক্তিকে দেখলে মনে হয় তিনি বিশেষ কোন সম্প্রদায় ভক্ত সন্ন্যাসী হবেন।
আবার যখন কন্ঠে তুলসী মালা, গায়ে তিলক চন্দন, মুখে কৃষ্ণনাম এর মধ্যদিয়ে বৈষ্ণবীয়
ভাবধারার ঈশ্বর আরাধনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে এগুলো ধর্মের বহিরঙ্গ দৃশ্য। বহিরঙ্গ
সজ্জারও উপযোগিতা আছে। যিনি গৈরিক বসন ধারণ করেছেন বা তিলক চন্দনাদি পরেছেন তিনি
তাঁর চিন্তা কর্মে আচার-আচরণে সতর্ক, সংযমী ও সহানুভূতিপ্রবণ হবেন এটাই আশা করা যায়।
এভাবে দেখা যায়, আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে ধর্মের বিশিষ্টরূপ প্রকাশিত হয়ে থাকে।

পূজা-পার্বণ

ঈশ্বর-উপাসনার দুটি প্রধান পদ্ধতি হলঞ্জ নিরাকার ও সাকার। নিরাকার উপাসনায় ঈশ্বরের কোন
রূপ বা মূর্তি থাকে না। তবে সাকার উপাসনায় ঈশ্বরের নানা গুণাবলী-ব্যঞ্জক মূর্তি কল্পনা করে
উপাসনা করা হয়। এই যে ঈশ্বরের সাকার উপাসনা একেই বলে পূজা-অর্চনা। ঈশ্বরের বিগ্রহ
তৈরি করে তার মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে সাধক ভক্তিভরে পুষ্প, বিল্বপত্র, চন্দন, ধরু, দীপ প্রভৃতি
অর্ঘ্য নিবেদন করেন। এটিই পূজাকর্ম। পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে ভক্ত ভগবানের সান্নিধ্য অনুভব
করেন; এবং নিজের প্রাণের আকুতি উপাস্য দেবতার নিকট নিবেদন করেন। এই পূজাকর্মের মধ্য
দিয়ে সাধকের বহিরঙ্গ এবং অন্তরঙ্গ উভয়ই হয় পবিত্র এবং ঈশ্বর অনুগ্রহ লাভের যোগ্য। পূজার
সঙ্গে যুক্ত আছে পার্বণের কথা। বৎসরের নির্ধারিত তিথিতে বিশেষ বিশেষ পার্বণ উপস্থিত হয়ে
থাকে। যেমন আশ্বিন মাসে কৃষ্ণ চতুর্দশী তিথিতে মহালয়া পার্বণ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এরকম
নবান্ন, পৌষপার্বণ, ইত্যাদি বারমাসে তের পার্বণ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ পার্বণ উদযাপনের মধ্য
দিয়ে ভক্ত দেহ ও মনে শুচিতা লাভ করেন এবং অন্তরে অনুভব করেন প্রশান্তি। এভাবে পূজাপার্বণের মধ্যদিয়ে ঈশ্বর অনুগ্রহ লাভের জন্য সাধক তৈরি হতে পারে। এই হল সংক্ষেপে
হিন্দুধর্মের উপাসনা পদ্ধতি।

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

Leave a Reply