তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন, সে জানে তোমারে ভোলা কি কঠিন

— কাজী নজরুল ইসলাম

“জমানো টাকার প্রকল্প”

যদি আপনার বাবার অনেক টাকা থাকে আর আপনি চাওয়া মাত্রই সব পেয়ে যান। যদি আপনার নিজের যথেষ্ট আয় রোজকার থাকে। তাহলে দুঃখিত এই লেখাটি আপনার জন্য নয়৷
যদি আপনার মা আপনাকে টিফিনের জন্য ২০ টাকা দিয়ে থাকে আর আপনি তার থেকে ১০ টাকা জমিয়ে রেখে দেন, যদি রিকশা ভাড়াটা খরচ না করে একটু কষ্ট করে হেটে প্রাইভেটে যান, ঈদের সেলামি পাওয়ার পর সবাই যখন সেটা দিয়ে কাচ্চি খাওয়ার প্ল্যান করে তখন যদি আপনি বুকে পাথর চাপিয়ে সেই প্ল্যান বাদ দিয়ে টাকাটা জমিয়ে রাখেন তাহলে হ্যাঁ এই লেখাটি আপনার জন্য।


ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর এক গবেষণায় দেখা যায় যে যাদের টাকা জমানোর অভ্যাস থাকে তাদের মধ্যে ১০০ তে ৭ জন হন হাড়কিপটে। অর্থাৎ তারা কোনো কিছু করার জন্য টাকা জমাননা। এটা তাদের কাছে যক্ষের ধনের মতো হয়। তবে ১০০ জনের মধ্যে বাকি ৯৩ জন টাকা জমান কোনো না কোনো কাজ করার জন্য, কোনো কিছু কেনার জন্য বা কাউকে সাহায্য করার জন্য৷


১. বইপত্র
ছোটবেলা থেকে Myself Paragraph এ My Name is __ এর পরে যে লাইনটা সবচেয়ে বেশি পড়েছি সেটা সম্ভাবত “Books are our best friends.” আসলেই কিন্তু তাই। বই পড়া মানুষের মাঝে এমন পরিবর্তন আনতে পারে যা হয়তো তাকে সংশোধনাগারে রেখেও সম্ভব না।
তো আপনার কষ্ট করে জমানো টাকা দিয়ে বই কিনলে লাভ বই লোকসান কোনোমতেই হবে না।
যেহেতু আপনার অঢেল টাকা নেই, তাই বই দেখেই কিনে ফেলবেন না৷ অনেক সময়ই আমরা সুন্দর কভার দেখে বই কিনে ফেলি, কিন্তু পরে দেখা যায় সেই বইয়ের কাহিনি আপনার ভালো লাগছে না বা আপনি তেমন বই পড়েন না৷ তাই বই কিনার আগে বিভিন্ন সাইট আছে, গ্রুপ আছে বা গুগল আছে, গুডরিডস আছে একটু দেখে নিন কোন বইটা কেমন৷ আরেকটা কথা, বইয়ের দাম বুকশপ, সেলার, কভার, পেজ কোয়ালিটি ইত্যাদি অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। উদাহরণ দেই, সেরা সন্দেশ বইটা কিছু জায়গায় দেখেছিলাম ৮৫০-৯০০ টাকা। তবে লোকাল ভালো প্রিন্ট একটু খুজলেই পাবেন ৩০০-৩৫০ টাকার মধ্যে। মানে সেই টাকায় আপনি আরো ২-৩ টা বই কিনতে পারবেন৷ এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখলে ভালো।

২. গয়নাগাটি/জুয়েলারি
মেয়েদের জন্য এই জিনিসটা এখন ম্যান্ডাটরি। শাড়ি পরে, ছবি তুলে পোস্ট করতে গেলেও এইটা লাগেই। তো যা দেখি তাই কিনতে মন চায় এমন ভাবনা না থাকাই ভালো৷ নেটে, পেজে বা কোনো অনলাইন শপের দোকানে যে ছবিগুলো দেওয়া হয় সেগুলো এডিট করা থাকে৷ তাই অনেক ক্ষেত্রেই ফিনিশিং, কালার বা ডিটেইলস ভালোভাবে বোঝা যায় না৷ তো প্রতিষ্ঠিত বা পরিচিত বা আপনি আগেও কিনেছেন কিংবা আপনার কোনো বান্ধবী কিনেছে এমন শপকে গুরুত্ব দিন৷ সিলভার, গোল্ডেন, গ্রে, ব্ল্যাক এইগুলো নিউট্রাল কালার। যেকোনো রঙের সাথে যায়। এগুলোর ভালো কালেকশন থাকলেই যেকোনো ড্রেসের সাথেই পড়া যায়। তবে স্টোনের কাজ বা কাস্টমাইজড হলে ভালো শপ দেখে কিনলেই ভালো।

৩. জামাকাপড়/স্পোর্টস কিট
ব্যক্তিগতভাবে ব্র‍্যান্ডেড দামি পোশাক পড়াটা আহামরি কিছু না বলেই আমি মনে করি৷ আমি অনেক মানুষকে দেখেছি টাকা থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেরাই ডিজাইন করে ভালো টেইলার দিয়ে বানিয়ে নেয়৷ এরজন্য পশ ডিজাইনারের দরকার নেই। আমাদের দেশের ৮০% মানুষই মধ্যবিত্ত। তারা সচ্ছল হতে পারে, তবে শৌখিন না। তবুও হতে পারে কোনো অনলাইন শপের বা কোনো ব্র‍্যান্ডের জামাকাপড় পছন্দ হলে বা ছেলেদের ক্ষেত্রে জ্যাকেট, হুডি, জার্সি, ব্যাট বা দামি স্পোর্টস কিট যদি আপনার পছন্দ হয়ে থাকে তাহলে বাবা মাকে এরজন্য চাপ দেবেন না। নিজে টাকা জমান, হয়তো সময় লাগবে। তবে সেই জিনিস টিকবে অনেক বেশি। আর হ্যাঁ, জামাকাপড় কেনার আগে অবশ্যই রঙ, ডিজাইন, ফিটিংস সব দেখে কেনা ভালো৷ পরে দেখা গেলো এতো সাধের ড্রেসটা পড়ে আয়নার সামনে গিয়ে দেখলেন ভালো লাগছে না।

৪. বাবা-মা বা বন্ধুদের জন্য উপহার
বাবা বা মাকে যখন নিজে একটা শার্ট বা শাড়ি কিনে দেবেন তাতে বাবা মা যেরকম খুশি হবে বফ-গফকে এর হাজারগুন দিয়েও খুশি করতে পারবেন না(ক্ষেত্রবিশেষে)। বাবা আপনার জন্য ভালো জামা কাপড় কিনতে গিয়ে হয়তো নিজেরটা কেনননি। মা কবে শাড়ি কিনেছেন ঠিক মনেই নেই। তবে আপনার মা যদি সাধারণত সালোয়ার কামিজ পরে থাকে তবে তার জন্য তাই কিনুন।
বন্ধু বান্ধবদের জন্মদিনে বা অন্যান্য কোনো বিশেষ দিনে দামী উপহার দেওয়ার জন্য বাবা-মার থেকে টাকা কেনো নেবেন? আপনার বান্ধবী বা বন্ধু কি পছন্দ করে আপনি জানেন। নিজের সাধ্যের মধ্যে তাই কিনে দিন তাকে৷ সে সত্যিই আপনার কাছের মানুষ হয়ে থাকলে সে তাতেই খুশি হবে। ভাব দেখাতে গিয়ে কোমড় ভাঙার কি দরকার?

৫. স্টার্টআপ/নিজের বিজনেস
বর্তমান সময়ে এই বিষয়টা বেশ প্রচলিত। আপনার জমানো টাকা দিয়ে আপনি হয়তো একটা ব্যবসা শুরু করলেন। এর থেকে আপনার আয়ও হবে আবার শখ-আহ্লাদও মিটবে। আপনি আগে ভাবুন আপনি কি পারেন৷ আপনি হয়তো ভালো ড্রইং পারেন, ক্রাফটিং পারেন, ডিজাইনিং পারেন, আপনার হয়তো লেখালেখির দক্ষতা আছে তাহলে সেগুলো কাজে লাগান। কাস্টমাইজড শব্দটা এখন অনেক জনপ্রিয়। মানে ইচ্ছামতো যেকোনো কিছু ডিজাইন করে নেওয়া। তো বড় বড় ব্র‍্যান্ড গুলো এগুলো সবার জন্য করে না। সেক্ষেত্রে আপনার বিজনেস এখন অনেক জনপ্রিয় হয়ে যেতে পারে যদি আপনার কাজ ও কোয়ালিটি ভালো হয়।

৬. কোর্স/ট্রেইনিং-
আমাদের অনেকরই অনেক কিছু শেখার ইচ্ছা থাকে, করার ইচ্ছা থাকে৷ এই যেমন প্রোগ্রামিং, ডিজাইনিং, ইংলিশ স্পিকিং, সিনেমেটোগ্রাফি আরো কত কিছু। অনেকের আবার ক্লাবে ভর্তি হয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল বা কারাতে, মার্শাল আর্ট ইত্যাদি শেখার ইচ্ছা থাকে। তো সেক্ষেত্রে হয়তো আপনার বাবা মা সেটা এফোর্ড করতে পারছেন না বা চাইছেন না যে আপনি এটা এখন করেন। তখন অনলাইন বা অফলাইন বিভিন্ন কোর্সে জমানো টাকাটা কাজে লাগিয়ে কাজটা শিখে নিতে পারলে তখন কিন্তু আয় করাও সম্ভব।

৭. স্টেশনারি / আর্ট সাপ্লাই-
যারা আর্টিস্ট বা আর্ট এন্ড ক্রাফটের সাথে যুক্ত তাদের জন্য এটা একটা বড় ব্যাপার। এখন ভালো কোয়ালিটির রঙ, তুলি, ক্যানভাস, স্কেচ পেন্সিল, গ্লু গান, পেপার ইত্যাদির অনেক দাম। তাই কিছু মাস যদি আপনি কোনো কিছু কেনার টার্গেট করে টাকা জমান তাহলেই কিন্তু আপনি আপনার কাঙ্খিত মন্টমার্টে সেট বা অনেক দিনের স্বপ্ন স্কেচ পেন্সিলের সেটটি কিনে ফেলতে পারবেন।

৮. ডিভাইস-
আপনার বন্ধুর ক্যানন ২০০ডি ক্যামেরা আছে, কারো হয়তো আইপড আছে, কারো ভালো একটা ট্যাবলেট আছে। আপনার নেই। তো সেটা নিয়ে তো হা-হুতাশ করে লাভ নেই। হয়তো ক্যামেরা আছে, কিন্তু আপনার একটা ভালো, লেটেস্ট মডেলের লেন্স দরকার। বাবা-মা আমাদেরকে তাদের সাধ্যমতো দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার জন্য নিজেকে ধন্য এবং ভাগ্যবান মনে করুন। শৌখিনতার জিনিসগুলোর জন্য তাদের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হবেন না। নিজে টাকা জমান বা আয় করার চেষ্টা করুন। নতুন না কিনতে পারলেও, দেখেশুনে নিলে সেকেন্ড হ্যান্ডও অনেক ভালো চলে। পুরোপুরি একই জিনিসের তো দরকার নেই, কন্সিডার করুন, কম্প্যায়ার করুন, আপনার যেটা পছন্দ সেটার মতো সেম ফিচারসহ অন্য কিছু দেখুন৷ তবে দেখে শুনে কিনুন।

৯. সাহায্য /ডোনেশন-
এইটা সম্পূর্ণরূপে আপনার মানসিক শান্তির জন্য। জমানো টাকা দিয়ে আপনি কিছু অসহায় মানুষকে সাহায্য করতে পারেন৷ আপনি একা করতে পারেন। আপনার কিছু বন্ধুকেও বলতে পারেন যাতে আপনার সাথে আসে বা তারাও যেনো কিছু কন্ট্রিবিউট করে। আবার কোনো প্রতিষ্ঠিত বা ওয়েলনোন কোনো ফাউন্ডেশনে দিতে পারেন৷

Writer: Sadia Islam

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0

Leave a Reply