হে বিশ্বাসীগণ নিজের আত্মাকে পাহারা দাও ৷ যদি তুমি ন্যায়ের অনুসরণ কর, বিপথগামীরা তোমার কোন ক্ষতিই করতে পারিবে না ৷

— আল কোরআন

হোম স্কুলিং এর মাধ্যমে শিশুর বিকাশঃ যা জানা থাকা প্রয়োজন

বর্তমান সময়ে, বিশেষ করে এই পেনডামিক প্রাক্কালে হোমস্কুলিং এর ধারণাটি খুব জমে উঠেছে। এখন অনেক প্যারেন্টকেই বলতে শোনা যায় বাচ্চাকে হোমস্কুলিং করাচ্ছি। যেটা বেশ ক’বছর আগেও অজানা ছিল। আজকে আমরা আলোচনা করা করব এই হোমস্কুলিং এর আদ্যোপান্ত নিয়ে।

হোমস্কুলিং কি?
এক কথায় ‘গৃ্হশিক্ষা’ হলো হোম স্কুলিং। সন্তানকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাংগনে না নিয়ে গিয়ে বাসায় পড়ানোর ব্যবস্থা করাই হোমস্কুলিং। এই পড়ানো হতে পারে মা-বাবা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে। অনেকসময় বাসায় টিউটর রেখেও হোমস্কুলিং এর স্বাদ নেয়া হয়।

ইতিহাস কি বলে?
১৯৭০ সালের দিকে ইউরোপে হোমস্কুলিং এর যাত্রা শুরু হয় হল্ট এবং মুরের মাধ্যমে, যারা পরিচিত ছিলেন এডুকেশন থিওরিস্ট হিসেবে। তারা দেখতে পান যে যেসব শিশুরা ৭/৮ বছরের আগেই স্কুলের গন্ডিতে প্রবেশ করছে তারা ভালো মানুষ হওয়ার চেয়ে ভালো চাকরি পাওয়ার দিকেই অধিক মনোযোগী। তাই তারা শিশু বয়সে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিপক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে, যতদিন যাচ্ছিল হোমস্কুলিং দিতে অনেক মা বাবাই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন। বয়সভেদে পড়াশুনার স্ট্যান্ডার্ড কেমন হওয়া উচিত তা অনেকেই বুঝতে পারছিলেন না। আবার সব অভিভাবকই যে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে শিক্ষাদান করতে পারবেন, তাও নয়। এসব দিকে খেয়াল রেখেই দেশগুলোর সরকার কিছু আইন ধার্য করে সেসব পরিবারের জন্য যারা হোমস্কুলিং করতে চায়। ফলে অনেক পরিবারই ব্যপারটির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে হোমস্কুলিং নিয়ে আরও অনেক স্কলাররাই কাজ করেন, সময়ের সাথে এর ধারণা ও ধরণেও পরিবর্তন আসে।

হোমস্কুলিং কেন?
হোমস্কুলিং এর প্রতি গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণটি হচ্ছে শিশুকে নৈতিক জ্ঞান তথা মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়া। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে প্রাচ্য থেকে যাওয়া পরিবারগুলো, কিংবা একটু কনজারভেটিভ পাশ্চাত্য পরিবারগুলো শিশুর গৃহশিক্ষার উপর মনোযোগ দেয় বেশি যেহেতু ওদের সংস্কৃতি অনেক বেশি খোলামেলা। আবার অনেকে সমকামিতার বিষবাষ্প থেকে সন্তানকে বাচাতে অনেকটা সময় পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপর গৃ্হশিক্ষাকেই প্রাধান্য দেয়।
প্রতিযোগিতামুলক মনোভাব এড়িয়ে চলার জন্য অনেক মাবাবা হোমস্কুলিংকে ভালো উপায় বলে মনে করেন। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানেই প্রতিযোগিতা। বুঝে হোক না বুঝে হোক, অনেক অভিভাবক শিশুর ভেতর একদম শিশুকাল থেকেই প্রতিযোগিতা ঢুকিয়ে দেয়। ও পারে, তাই তোমাকেও পারতে হবে, তুমি কেন পারবেনা– এই বিষয়গুলো স্কুলে গেলে যতটা ফেস করতে হয়, বাসায় বসে পড়লে ততটা হয়না। তাই হোমস্কুলিং অনেকের কাছেই ভালো একটা অপশন।
হোমস্কুলিং এ একজন অভিভাবক সন্তানের শিক্ষার পেছনে যতটা সময় দিতে পারেন, সন্তানের সবলতা, দূর্বলতার জায়গাগুলো যতটা তাড়াতাড়ি ধরতে পারেন, বাচ্চা স্কুলে চলে গেলে সেয়া অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়না। বাসায় উপযুক্ত পরিবেশে, বাবা মায়ের সান্নিধ্যে শিশু মনে সহজেই উপযুক্ত শিক্ষার বীজটি বপিত হয়ে যায়।
একটা ভালো স্কুল দূরবর্তী এলাকায় হলেই গৃহশিক্ষাকে প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে পরিবারের অর্থনৈতিক কারণ গৃহশিক্ষার পেছনে কতটা শক্তিশালী ভুমিকা রাখে তা বলা না গেলেও, গেল বছরগুলোতে করোনার প্রভাবে যখন বহু পরিবার বাস্তুহারা হয়ে পড়ে, সন্তানের শিক্ষার জন্য তারা হোমস্কুলিকেই বেছে নেয়।

বাংলাদেশে হোমস্কুলিং আছে কি?
অনানুষ্ঠানিকভাবে, বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরেই হোমস্কুলের ব্যবস্থা আছে। স্কুলে ভর্তির আগে এখানকার মা বাবারা যতটা সম্ভব অ,আ,ক,খ পড়িয়ে দেন। তবে আনুষ্ঠানিক উপায়ে হোমস্কুলের কন্সেপ্ট নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘হোমস্কুলিং উইথ নুর’ ২০১৯ সালে। এ প্রতিষ্ঠানটি মূলত যেসব মা বাবা তাদের বাচ্চাদেরকে হোমস্কুলিং করাতে চান তাদেরকে সাপোর্ট দেয়। এখনকার দিনে অনেক বাচ্চারাই ছোট বেলা থেকে ডিভাইস এর প্রতি আসক্ত থাকে। পড়ালেখা তাদের কাছে মোটেও আকর্ষণ এর বিষয়বস্তু হয়না। সেক্ষেত্রে পড়াশুনাকে কিভাবে বাচ্চাদের কাছে আকর্ষণীয় করা যায়, কিভাবে খেলতে খেলতে অক্ষরজ্ঞান দেয়া যায়, বিভিন্ন শারীরিক ও মানষিক গুনাগুন রপ্ত করানো যায়, তা নিয়েই প্রতিষ্ঠানটি মূলত কাজ করে। অন্যদিকে, যেসব অভিভাবক ধর্মীয় শিক্ষাটাকে গল্পের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করতে চান তাদের জন্যও কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

আমি কিভাবে হোমস্কুলিং করাতে পারব?
মূলত অভিভাবক আর সন্তানের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখেই হোমস্কুলিং এর ধাপগুলি সাজানো যেতে পারে। তবে এগুলোকে ধাপ না বলে উপায় বলা বাঞ্চনীয় হবে।
উপায় ১: প্রথমেই যোগাযোগ করুন এমন কোন মা বাবার সাথে যারা বাচ্চাকে হোমস্কুলিং দিচ্ছে। এলাকায় যদি এমন কোনো প্রতিষ্ঠান থাকে যারা এ ধরনের স্কুলিং এর সাথে যুক্ত তাহলে তাদের থেকেও আইডিয়া নেয়া যেতে পারে।
উপায় ২: সন্তান কিভাবে আর কখন পড়তে চায় তা খুজে বের করুন। কারণ প্রতিটি বাচ্চারই টেস্ট আলাদা।
উপায় ৩: সে অনুযায়ী একটা রুটিন করে ফেলুন। অবশ্যই প্রতিদিন একই জিনিস পড়বেনা বা শিখবেনা, তাতে একঘেয়েমি চলে আসতে পারে।
উপায় ৪: এবার আসি শিশুর পছন্দের দিকটায়। যা-ই পড়বে, যা-ই শিখবে সেখানে যেন রঙের আধিক্য থাকে। শিশুরা রঙ পছন্দ করে। তার সাথেসাথে শিশুরা কোন বস্তুর কি রঙ তা-ও শিখে ফেলতে পারবে।
উপায় ৫: বাজারে এখন প্রচুর লার্নিং ইন্সট্রুমেন্ট পাওয়া যায়। ব্লাক বোর্ড, হোয়াইট বোর্ড, মেথমেটিকাল আইটেমস, চাইলে এগুলো কিনে ফেলতে পারেন। নয়তো নিজেও বানিয়ে নিতে পারেন। যেমন, রঙিন কাগজ কেটে অক্ষর, কিংবা সংখ্যা বানিয়ে ফেলুন এবং তা দিয়ে একটা মালা বানিয়ে ফেলুন। বাসায় ফল, মাছ, সবজি কিনে আনলে তা শিশুকে চিনিয়ে দিন।
উপায় ৬: বাজারে প্লেয়িং ডো কিনতে পাওয়া যায়, সেটা কিনে দিন। নয়তো ঘরে সকালে রুটি বানানোর জন্য যে আটা, ময়দা থাকে তা দিয়েই তাকে রুটি বানাতে বলুন। বলুন কেটে ফুল, ফল বানাতে। আমার জানা মতে বাচ্চারা আটার এই দলা খুব পছন্দ করে।
উপায় ৭: ঠিক একই ভাবে দিনে শিশুটি কয়টি ভালো কাজ করলো তা ছোট্ট কোন খেলনা দিয়ে মার্ক করে রাখলে সংখ্যা গনণাও শিখবে, আবার ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাবে।

শেষ কথা
সেই ছেলেবেলায় আমরা মোটামুটি সবাই হোমস্কুলিং করেছিলাম। হোমস্কুলিং এর কন্সেপ্ট আমাদের জীবনে বহু আগে থেকেই ছিলো। কিন্তু এটার শাব্দিক প্রয়োগ হয়তো ছিলনা। সময়ের পালাবদলের সাথে সাথে পুরনো ধারণার সাথে নতুন কিছু উপায় আর উদ্যোগ মিলে হোমস্কুলিং এখন বর্তমান সভ্যতার দাবী হয়ে উঠেছে। আর তাই প্রত্যেক মা বাবাকে সাকসেস্ফুল হোমস্কুলিং এর বিষয়গুলো আত্নস্থ করে ফেলতে হবে।

Writer: MAKSUDA HOSSAIN

What’s your Reaction?
+1
3
+1
0
+1
0
+1
0
+1
1
+1
0
+1
0

Leave a Reply