সুখ কখনও আবিষ্কার করা যায় না। এটি সবসময় তোমার কাছে আছে এবং থাকবে। তোমাকে কেবল দেখার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

— গৌতম বুদ্ধ

ইচ্ছাপূরণ -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুবলচন্দ্রের ছেলেটির নাম সুশীলচন্দ্র। ছেলেটি পাড়াসুদ্ধ লোককে অস্থির করিয়া বেড়াইত, সেইজন্য বাপ মাঝে মাঝে শাসন করিতে ছুটিতেন: কিন্তু বাপের পায়ে ছিল বাত, আর ছেলেটি হরিণের মতো দৌড়িতে পারিত: কাজেই কিল চড় চাপড় সকল সময় ঠিক জায়গায় গিয়া পড়িত না।
আজ শনিবারের দিনে দুটো সময় স্কুলের ছুটি, কিন্তু আজ স্কুলে যাইতে সুশীলের কিছুতেই মন উঠিতেছিল না। তাহার অনেকগুলো কারণ ছিল। একে তো আজ স্কুলে ভূগোলের পরীক্ষা, তাহাতে আবার ও পাড়ার বোসদের বাড়ি আজ সন্ধ্যার সময় বাজি পোড়ানো হইবে। সুশীলের ইচ্ছা, সেইখানেই আজ দিনটা কাটাইয়া দেয়।
অনেক ভাবিয়া, শেষকালে স্কুলে যাইবার সময় বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়িল। তাহার বাপ সুবল গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কী রে, বিছানায় পড়ে আছিস যে। আজ ইস্কুলে যাবি নে?’ সুশীল বলিল, ‘আমার পেট কামড়াচ্ছে, আজ আমি ইস্কুলে যেতে পারব না!’
সুবল তাহার মিথ্যা কথা সমস্ত বুঝিতে পারিলেন। মনে মনে বলিলেন, ‘রোসো, একে আজ জব্দ করতে হবে।’ এই বলিয়া কহিলেন, ‘পেট কামড়াচ্ছে? তবে আর তোর কোথাও গিয়ে কাজ নেই। বোসেদের বাড়ি বাজি দেখতে হরিকে একলাই পাঠিয়ে দেব এখন। তোর জন্যে আজ লজঞ্জুস কিনে রেখেছিলুম, সেও খেয়ে কাজ নেই। তুই এখানে চুপ করে পড়ে থাক আমি খানিকটা পাঁচন তৈরি করে নিয়ে আসি।’
এই বলিয়া তাহার ঘরে শিকল দিয়া সুবলচন্দ্র খুব তিতো পাঁচন তৈয়ার করিয়া আনিতে গেলেন। সুশীল মহা মুশকিলে পড়িয়া গেল। লজঞ্জুস সে যেমন ভালোবাসিত পাঁচন খাইতে হইলে তাহার তেমনি সর্বনাশ বোধ হইত। ও দিকে আবার বোসেদের বাড়ি যাইবার জন্য কাল রাত হইতে তাহার মন ছটফট করিতেছে, তাহাও বুঝি বন্ধ হইল।
সুবলবাবু যখন খুব বড় এক বাটি পাঁচন লইয়া ঘরে ঢুকিলেন সুশীল বিছানা হইতে ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া বলিল, ‘আমার পেট কামড়ানো একেবারে সেরে গেছে, আমি আজ ইস্কুলে যাব।’
বাবা বলিলেন, ‘না না, সে কাজ নেই, তুই পাঁচন খাইয়া এইখানে চুপচাপ করে শুয়ে থাক।’ এই বলিয়া তাহাকে জোর করিয়া পাঁচন খাওয়াইয়া ঘরে তালা লাগাইয়া বাহির হইয়া গেলেন।
সুশীল বিছানায় পড়িয়া কাঁদিতে কাঁদিতে সমস্তদিন ধরিয়া কেবল মনে করিতে লাগিল যে, ‘আহা, যদি কালই আমার বাবার মতো বয়স হয়, আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি, আমাকে কেউ বন্ধ করে রাখতে পারে না।’
তাহার বাপ সুবলবাবু বাহিরে একলা বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন যে, ‘আমার বাপ মা আমাকে বড় বেশি আদর দিতেন বলেই তো আমার ভালোরকম পড়াশোনা কিছু হলো না। আহা, আবার যদি সেই ছেলেবেলা ফিরে পাই তা হলে আর কিছুতেই সময় নষ্ট না করে কেবল পড়াশোনা করে নিই!’
ইচ্ছাঠাকরুন সেই সময় ঘরের বাহির দিয়া যাইতেছিলেন। তিনি বাপের ও ছেলের মনের ইচ্ছা জানিতে পারিয়া ভাবিলেন, আচ্ছা, ভালো, কিছুদিন ইহাদের ইচ্ছা পূর্ণ করিয়াই দেখা যাক।
এই ভাবিয়া বাপকে গিয়া বলিলেন, ‘তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হইবে। কাল হইতে তুমি তোমার ছেলের বয়স পাইবে।’ ছেলেকে গিয়া বলিলেন, ‘কাল হইতে তুমি তোমার বাপের বয়সী হইবে।’ শুনিয়া দুইজনে ভারি খুশি হইয়া উঠিলেন।
বৃদ্ধ সুবলচন্দ্র রাত্রে ভালো ঘুমাইতে পারিতেন না, ভোরের দিকটায় ঘুমাইতেন। কিন্তু আজ তাঁহার কী হইল, হঠাত্ খুব ভোরে উঠিয়া একেবারে লাফ দিয়া বিছানা হইতে নামিয়া পড়িলেন। দেখিলেন, খুব ছোট হইয়া গেছেন, পড়া দাঁত সবগুলো উঠিয়াছে, মুখের গোঁফদাড়ি সমস্ত কোথায় গেছে, তাহার আর চিহ্ন নাই।
আমাদের সুশীলচন্দ্রের কাপড়চোপড়গুলো গায়ে এমনি আঁটিয়া গেছে যে, ছিড়িয়া ফাটিয়া কুটিকুটি হইবার জো হইয়াছে; কাঁচা-পাকা গোঁফে-দাড়িতে অর্ধেকটা মুখ দেখাই যায় না, মাথায় একমাথা চুল ছিল, এখন পরিষ্কার টাক তক তক করিতেছে।
আগেই বলিয়াছি, সুশীলচন্দ্র মনে করিত যে, সে যদি তাহার বাবা সুবলচন্দ্রের মতো বড় এবং স্বাধীন হয়, তবে যেমন ইচ্ছা গাছে চড়িয়া, জলে ঝাঁপ দিয়া, পাখির বাচ্চা পাড়িয়া, যখন ইচ্ছা ঘরে আসিয়া যাহা ইচ্ছা তাহাই খাইবে, কেহ বারণ করিবার থাকিবে না। কিন্তু আশ্চর্য এই, সেদিন সকালে উঠিয়া তাহার গাছে চড়িতে ইচ্ছাই হইল না। পানাপুকুরটা দেখিয়া তাহার মনে হইল, ইহাতে ঝাঁপ দিলেই আমার কাঁপুনি দিয়া জ্বর আসিবে।
আগেই বলিয়াছি, বাবা সুবলচন্দ্র প্রতিদিন দাওয়ায় মাদুর পাতিয়া বসিয়া ভাবিতেন যখন ছোট ছিলাম তখন দুষ্টামি করিয়া সময় নষ্ট করিয়াছি, ছেলেবয়স ফিরিয়া পাইলে সমস্তদিন শান্তশিষ্ট হইয়া, ঘরে দরজা বন্ধ করিয়া বসিয়া, কেবল বই লইয়া পড়া মুখস্থ করি। এমন-কি সন্ধ্যার পরে ঠাকুরমার কাছে গল্প শোনাও বন্ধ করিয়া প্রদীপ জ্বালিয়া রাত্রি দশটা এগারটা পর্যন্ত পড়া তৈয়ারি করি।
কিন্তু ছেলেবয়স ফিরিয়া পাইয়া সুবলচন্দ্র কিছুতেই স্কুলমুখো হইতে চাহেন না। সুশীল বিরক্ত হইয়া আসিয়া বলিত, ‘বাবা, ইস্কুলে যাবে না?’ সুবল মাথা চুলকাইয়া মুখ নিচু করিয়া আস্তে আস্তে বলিতেন, ‘আজ আমার পেট কামড়াচ্ছে, আমি ইস্কুলে যেতে পারব না।’ সুশীল রাগ করিয়া বলিত, ‘পারবে না বৈকি! ইস্কুলে যাবার সময় আমারও অমন ঢের পেট কামড়েছে, আমি ও-সব জানি।’
সুবলচন্দ্র এক-একদিন দৈবাত্ ভুলিয়া যাইত যে, সে আজকাল ছেলেমানুষ হইয়াছে। আপনাকে পূর্বের মতো বুড়া মনে করিয়া, যেখানে বুড়ামানুষেরা তাসপাশা খেলিতেছে সেইখানে গিয়া সে বসিত এবং বুড়ার মতো কথা বলিত; শুনিয়া সকলেই তাহাকে ‘যা যা, খেলা করগে যা, জ্যাঠমি করতে হবে না’ বলিয়া কান ধরিয়া বিদায় করিয়া দিত। হঠাত্ ভুলিয়া মাস্টারকে গিয়া বলিত, ‘দাও তো, তামাকটা দাও তো, খেয়ে নিই।’ শুনিয়া মাস্টার তাহাকে বেঞ্চের ওপর একপায়ে দাঁড় করাইয়া দিত।
তখন সুবল একান্তমনে প্রার্থনা করিতে লাগিল যে, ‘আহা, যদি আমি আমার ছেলে সুশীলের মতো বুড়ো হই এবং স্বাধীন হই, তাহা হইলে বাঁচিয়া যাই।’
সুশীলও প্রতিদিন জোড়হাত করিয়া বলে, ‘হে দেবতা, বাপের মতো আমাকে ছোট করিয়া দাও, মনের সুখে খেলা করিয়া বেড়াই। বাবা যেরকম দুষ্টামি আরম্ভ করিয়াছেন, উহাকে আর আমি সামলাইতে পারি না, সর্বদা ভাবিয়া অস্থির হইলাম।’
তখন ইচ্ছাঠাকরুন আসিয়া বলিলেন, ‘কেমন, তোমাদের শখ মিটিয়াছে?’
দুজনেই বলিলেন, ‘মিটিয়াছে, এখন আমরা যে যাহা ছিলাম আমাদিগকে তাহাই করিয়া দাও।’
ইচ্ছাঠাকরুন বলিলেন, ‘আচ্ছা, কাল সকালে উঠিয়া তাহাই হইবে।’
পরদিন সকালে সুবল পূর্বের মতো বুড়া হইয়া এবং সুশীল ছেলে হইয়া জাগিয়া উঠিলেন। দুইজনেরই মনে হইল যে, স্বপ্ন হইতে জাগিয়াছে। সুবল গলা ভার করিয়া বলিলেন, ‘সুশীল, ব্যাকরণ মুখস্থ করবে না?’
সুশীল মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল, ‘বাবা, আমার বই হারিয়ে গেছে।’
[সংক্ষেপিত]

What’s your Reaction?
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0
+1
0